Pay with:

লকডাউনে চলছে – ইশিখনের সর্বকালের সেরা অফার! ৪৩০/- থেকে ১৩৫০/- টাকার প্রতিটি কোর্সের ডিভিডি ডাউনলোড এখন মাত্র ২১৫/- থেকে ৬৭৫ টাকা। বিস্তারিত

স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা

মমতাজ উদ্দীন আহমদ

লেখক পরিচিতি
পাঠ পরিচিতি
অনুশীলনী কর্ম

চরিত্র পরিচিতি নর মোহাম্মদ – দারোগা (বয়স ৪৫) দলিলুর রহমান – পুলিশের সিপাহী (বয়স ২৫) আব্দুল বারেক ম-ল – -ঐ- লোক – (বয়স ক্ত৫) [দৃশ্য পরিকল্পনা : বাংলাদেশের একটি ছোট গঞ্জের নদীর ফেরিঘাট। রাত নয়টা। কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার। টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছে] দলিল : একটা পোস্টারের কাগজ এইটার বুকে সাঁটব ? বারেক : ছোটবাবুকে বলি। স্যার একটা পোস্টার এই পিঁপেটাতে লাগিয়ে দিই। দলিল : মাঝিমাল্লা আর ঘাটের রাহীদের নজরে পড়বে। নর : কিছু দেখছ, ভালো করে দ্যাখ। বদমায়েশটার পায়ের দাগ। কাঁচা মাটিতে দগদগ করছে। দলিল : ফেরিঘাট তো স্যার। দিনেরাতে শয়ে শয়ে রাহী পারাপার করছে। আসামির পায়ের ছাপ নাও
হতে পারে। নর : তুমি একটা বেকুব। আরো দশরকম পায়ের দাগ থাকতে আমি এই একটাকেই পয়েন্ট করলাম কেন ? এটা সাধারণভাবে পা ফেলে হাঁটা নয়, সাব্রানের সঙ্গে হাঁটা। দ্যাখো, এই লাইন ধরে নজর দাও। কি দেখছ ? কোনটাতে সামনের আঙ্গুল ডেবে আছে, আর কোনটাতে গোড়ালি। আসামি সোজা পথে ঘাট দিয়ে নামেনি। হারামিটা আবার এই পথ দিয়েই ঘাটে আসবে। বারেক : নাও তো ফিরতে পারে স্যার ! নর : হহৃা, নাও তো ফিরতে পারে, আবার ফিরতেও পারে। আমাদের কাজ হলো সন্দেহ হলেই থমকে দাঁড়াও, কুকুরের নাক দিয়ে শুঁকে দ্যাখ যদি কোন সূত্র পাও। আমার সন্দেহ হয়, কুত্তার বাচ্চা এইখান দিয়েই নদীর ওপারে যাবে। যেতে হবে। ঘাটে নামার মত আর কিনার নাই। আসামির
মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য ১২১
দিলের দোস্তর া সময় মত এই কিনার ধরে ডিঙি বল আর নৌকাই বল নিয়ে ঘুর ঘুর করবে আর ইশারা পেলেই ঘাটে ডিঙি লাগাবে আর ফুস করে পার হয়ে যাবে। এ তোমার মত আহম্মক লোক নয়। ভিন কিসিমের মাল। মগজের পোড়ে পোড়ে বুদ্ধি। এ জায়গাটা ছাড়া যাবে না হে। দলিল : আমাদের একটা পোস্টার এই কেরাসিন তেলের পিঁপেটার বুকে লাগিয়ে দেব স্যার। নর : কোথায় ? হহৃা লাগাও। আচ্ছাসে লেই দিয়ে কাঁচা রক্তের মত সেঁটে দাও। দেশের মানুষ
দেখুক। দলিল : দু’হাজার টাকা পুরস্কার, কম হয়েছে স্যার। নর : কেন ? দলিল : দশ বিশ হাজার টাকার লোভেও ঐ লোকটাকে কেউ ধরিয়ে দিবে না। দেশের এত বড় একটা বিপ−বী। নর : ওসব ভাবনা এখন বাতিল করে কাজে মেজাজ দাও। এইখানে আমি থাকলাম ডিউটিতে। দেখি
তোমাদের নয়নের চাঁদ বিপ−বীর বাচ্চা কি করে আজ রাতে ডিঙিতে ওঠে। বারেক : আপনি একলাই থাকবেন ? নর : আলবৎ। একাই থাকব। চব্বিশ বছর পুলিশের চাকুরী করছি, আমাকে ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়। তোমার ঐ বিপ−বী দুলাভাই একটা মাছ-মারা জালুয়ার ছদ্মবেশ ধরে আসবে। ঘাড়ে জাল, হাতে হুক্কা। শালা, আয়, তুই থাকিস গাছের ডালে আর আমি থাকি তোর মগডালে। দলিল : লোকটা খুব ধড়িবাজ। আমরাও আপনার সঙ্গে থাকি। নর : না। বারেক : আমাদের কিন্তু সবদিকেই বিপদ। নর : ম-ল, তোমার কথাতে বদ গন্ধ ঢুকেছে। বুকে সাহস রেখে ঈমানের সঙ্গে কাজ কর। আমরা
হলাম হুকুমের টহলদার। আইন-আদালতের হেফাজতি পুলিশের ঈমানের কাছে।
[বারেক এবং দলিল পোস্টার ও আঠা নিয়ে চলে গেল] কে ? কে যায় ? এই শালা। [একজন লোক লম্বা চুল। মুখে দাড়ি। গ্রামে গঞ্জে এ জাতের লোক পুঁথি কিস্সার গান গায়, কেতাব বিক্ষি করে] লোক : মালিক, ঘাটে যাব, নদ্দীর ওপারে হামার বাড়ি। নর : আর এক পা ফেলবি না। গুলি দিয়ে ঠ্যাঙ নুলা করে দিব। লোক : ইয়া আল্লা ! হামমিরে যাব যে ! হামার জন্য কাঁদনের কেউ নাই সংসারে। নর : এই কাঁদিস না। কে তুই ? লোক : ফকির গরীবুল্লাহ হামার নাম। নর : এই ফকিরের বাচ্চা, ঘাটে নামিস না। গঞ্জের দিকে ফিরে যা। লোক : ঘাটে নামিনমিালিক। এই পাড়ে বসে একটা গান ধরব, রসের গান। রসের গান শুনে মাঝিরা যদি দুটা একটা কেতাব কিনে লেয়, ভাত খাওয়ার পয়সা হয়ে গেল। তখন ধরেন যে এক শোয়াতে রাত ভোর করে দিনু। নর : আমি গানটান ভালোবাসি না। লোক : না শুনলে ভালোবাসবেন কেমন করে হুজুর। বগাবগির গান মানে যে কলজে পানি করা গান;
[গাইন গাইছে : বগা ফান্দে পইড়া বগি কাঁন্দেরে] নর : এই শালা বগার ভাতিজা। এই তোর গান ? গানটার জান কবজ করে দিলি। যেটি ভাগ, ফিরে যা। এখানে আমার জরুরি কাজ আছে। তোর সঙ্গে বেহুদা কথা বলবার সময় নাই। আচ্ছা লোকটা দেখতে কেমন ?
১২২ মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য
লোক : দেখিনি হুজুর। নর : বলবি না ? লোক : ইয়া আল্লা, মরে যাব যে মালিক। বলছি, হামাদের গাঁয়ে দেখছি। নর : দেখতে জোয়ান ? লোক : হহৃা, তাগড়া জোয়ান, হানিফা পালোয়ানের মতোন সিনা। বাঘের মতোন লাল ঘোল্লা চোখের মণি। লাঠি, ছোরা, বন্দুক সব চালাতে জানে। আর হাতের কব্জি (পিঁপেতে ঘুষমিেরে) এই রকম লোহার মতন শক্ত। একবার যদি হাত তুলে নর : হারামির হাত আমি গুলমিেরে ভেঙে দিব। লোক : খবরদার মালিক, খবরদার। ও কাজ ভুল করেও করতে যাবেন না হুজুর। একবার একটা জিদ্দি পুলিশ ডাকাতটাকে ধরতে গিয়েছিল, রাইফেল তুলে মারতে যাবে, ব্যাস নাই। এক থাপ্পড়ে পুলিশের এই গালের হাড্ডি ঝুর ঝুর ঝুর ঝুর করে পড়ে গেল। নর : তারপর ? লোক : তারপর আর কি হয়। পুলিশের রাইফেল হাতেই থাকল, এন্তেকাল এসে গেল। নর : দারোগা সাহেবও এন্তেকাল ! লোক : না না মালিক। কতক্ষণ কোরবানির কাটা গরুর মতোন ছটফট ছটফট করল, পা দুটা টান করল তারপর মানে যে যন্ত্রপাতি বন্ধ। এখন মানে যে একে আপনি কি বলবেন মালিক খতম, রোজকিয়ামত ? নর : চুপ কর। এই শালা হারামিটা বেঁচে থাকলে দেশের আমলা পুলিশের জান বাঁচবে কি করে ? লোক : বাঁচবে না মালিক। এই লোক থাকলে জোদ্দার কমিালদারের বংশের আর গোরে মোমবাত্তি জ্বলবে না। হুজুর, আপনি তো ঘাটের এই ডাহিন দিকে নজর রেখেছেন লোকটা এপথে আসবে বলেই নর : কেন ? লোক : না মানে যে, ডাহিন দিকে তাকালে যদি বাঁদিক দিয়ে আসে। নর : তখন বাঁদিকে ঘুরে তাকাব ! লোক : ততক্ষণ কি সময় পাবেন মালিক। খোদা না খাস্তা, যদি আসেই, বাঘের মতোন লাফিয়ে আমার
মালিকের ঘাড়ে নর : তখন কী হবে গরীবুল্লাহ ? লোক : কী আর হবে মালিক। আপনমিানে যে শুয়ে পড়লেন কতক্ষণ বেদিশা হয়ে পড়ে থাকলেন,
বাপদাদার নাম মনে করলেন, দেখলেন যে আসমান জমিন। নর : ভালো বলেছ গরীবুল্লাহ। লোক : মালিক নর : আল্লার রহমতে যদি ধরতে পারি, সরকারি বখশিশের ভাগ দাবি করবে ? লোক : না মালিক। হামি একটা সামান্য জীব। দেশের হাজার হাজার মানুষ হামার গান শুনে খুশমিনে দু’চার আনা পয়সা দেয়, ওতেই হামার দিন চলে যায়। হামি সরকারের পুরস্কার লিয়ে কি করব। নর : তুমি একটা ভালো মানুষের পয়দা হে গরীবুল্লাহ। ঈমান ঠিক রেখে বেঁচে থাক। তোমাদের মত
লোক দেখতে পাই না। চোর-ডাকাত দেখে দেখে পুলিশের রুহু পচে গেছে। লোক : মালিক, হামি একটা বিড়ি খাই। খুব নেশা ধরেছে, আপনি খাবেন একটা ? নর : না রে ভাই। অভ্যাস নাই। বাজে খরচের মধ্যে যেতে পারি না।
মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য ১২ক্ত
লোক : মালিকের উপরি আর্ন টায় হয় না কিছু ? নর : হয়, কিন্তু নিই না। আমার বাপের কসম আছে। মাঝে মধ্যে মনটা খিঁচড়ে ওঠে, কী হবে মরা বাপের কথার মল্য দিয়ে। কিন্তু বুকটা ধক্্ ধক্্ করে। এসব করি না বলেই তো চব্বিশ বছরে চাকরিতে প্রমোশন হলো না। লোক : লোকটাকে ধরতে পারলে দু’হাজার টাকা পুরস্কার পাবেন। বড় মেয়ের বিয়া দিতে পারবেন। নর : ধরতে পারলে তো। তুমি যেসসব কথা বলছ। লোকটা বুকভরা এত সাহস আর শক্তি কোথায়
পায়। তুমি শালা বানিয়ে বানিয়ে আমাকে ধোঁকা দিচ্ছ না তো ? লোক : মালিক হামি গান বানাই ঠিকই, কিন্তু মানুষ বানাব কোন সাহসে। মানুষ তো বানায় দুনিয়ার
সুরত
[গান : একুল ভাঙে ওকুল গড়ে এই তো নদীর খেলা] নর : গরীবুল্লাহ, এ তুমি কোন গান ধরলে। বুকটা হু হু করে উঠে। বাংলার বাদশা পালিয়ে যাচ্ছে,
বাংলা পরাধীন, গাও ভাই গাও।
[ গান চলছে ] বাংলা ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা, কে তাকে আশা দিবে, কে তাকে ভরসা দিবে, কেমন সুন্দর কথা, যতবার শুনমিনে হয় বুকের মধ্যে ধরে রাখি। লোক : মালিক, হামাদের দেশ তো নদীর দেশ, সবুজ ধানের দেশ। তবুও হামরা এত দুঃখী কেন
মালিক? নর : সব তকদিরের খেলা রে ভাই। কপালে দুঃখ থাকলে সুখ তো পাবে না। লোক : হামি আর কী বলব। আপনার দুঃখ কেউ বুঝল না, হামার জ্বালা কেউ বুঝতে চায় না। হামাদের মগজের মধ্যে দিনরাত কিসব আলতুফালতু ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে হামাদের শক্তি কেড়ে নিচ্ছে, হামাদের সাহসকে গোর দিচ্ছে। আর এই সুযোগে যত সব জালেম আল্লার নাম ভাঙিয়ে হামাদের শরীল থেকে শোঁ শোঁ করে রক্ত শুষে লিয়ে বিদেশে পাচার করছে মালিক। আপনারা এসব রুখতে পারেন না কেন ? নর : তুমি শালা একটা উজবুক। বিড়াল হয়ে বাঘের মুখে থাপ্্পড় দিতে চাও। লোক : হামার বাপজান বলত, গরীবুল্লাহ, বেটা অনাহক যারা তাল ঠুকে, তারা খুব বড় কিসিমের গায়েন নয়। কথাটা ঠিক না বেঠিক একবার পরখ করবেন মালিক। হামাদের এই ভাঙা ফুটা শরীল নিয়ে তামাম মানুষ যদি এক জায়গাতে হাজির হতে পারতাম, একবার যদি জালেমের লোভের কব্জিতে দাঁত বসাতে পারতাম, রক্তের নেশাতে গজরাতে পারতাম, তখন বুঝা যেত কারা বিলাই আর কারা বাঘ। যুদ্ধই তো হয় না মালিক, মরণ বাঁচার লড়াই। হামরা এই নদীর দেশের মানুষ একটা যুদ্ধ চাই মালিক, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ। নর : গরীবুল্লাহ তোমার কপালে ঢের দুঃখ আছে, এসব কথা বলো না। লোক : সেই দুঃখই তো হামি চাহমিালিক। দুঃখের নদীতে আর কতকাল এমন করে ভাসব, তার চেয়ে
উঠুক না কেন আসমান জুড়ে কালো ম্যাঘ, উথাল পাথাল ঢেউ, আর প্রলয় বাতাস
[ গান : খরবায়ু বয় বেগে চারিদিক ছায় মেঘে ওগো নেয়ে নাওখানি বাইয়ো] নর : এই গরীবুল্লাহ, তুমি এ গান পেলে কোথায় ? এ তো তোমার স্কুল-কলেজের গান। কিছু
পড়ালেখা শিখেছ নাকি ?
১২৪ মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য
লোক : হামার গাঁয়ের একটা শিক্ষার্থী শহরে পড়ে, তার মুখে শুনেছমিালিক। সেই শিক্ষার্থী এখন জেলখানাতে
বন্দী। নর : কিসের আসামি লোক : ঐ আপনার লাটসাহেবের মিটিং যে হলো, তার যে গ-গোল, তারই মধ্যে ছিল। নর : বেকুবের মতোন এসব হুজ্জতের মধ্যে যায় কেন ? লোক : ও ছেলে মানে যে আগুন দিয়ে তৈরি, অন্যায় কথা সহ্য করতে পারে না। বললে বলে, গারদ ফাটক একদিন সব খান খান করে ভেঙে ফেলব। মালিক, আপনি তো বিধটিশ আমলের ছাত্র। দেশের স্বাধীনতার জন্য আপনার মনটাতে হাহাকার করতো না। নর : করতো না কি গরীবুল্লাহ, ইংরেজকে তাড়াবার জন্য কত কী করতাম। লাঠি চালাতাম, রক্তের মধ্যে আগুন ধরে যায় এমন সব গান শিখতাম। একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি, আমি হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে জগতবাসী, তুমি জান নাকি গানটা ? লোক : (গান) কলের বোমা তৈরী করে, দাঁড়িয়ে ছিলাম লাইনের ধারে, লাট সাহেবকে মারব বলে,
মারলাম স্বদেশবাসী। নর : সাবাস গরীবুল্লাহ, আবার গাও। লোক : আমি হাসি হাসি পরব ফাঁসি, দেখবে জগতবাসী। নর : ঐখানে গাও, চিনতে যদি না পারিস মা, দেখবি গলায় ফাঁসি।
[ দু’জনে এক সঙ্গে গান গাইছ ] এসব বহুত পুরাতন কথা গরীবুল্লাহ, এখন যুগ জামানার ভিন্ন স্বাদ। দেশের মধ্যে নানান রকম কথাবার্তা শুরু হয়েছ্ েকখন যে কি হয়। এই চাকরি করলে কি হবে, বুঝি গরীবুল্লাহ, কিছু কিছু বুঝি। কিন্তু আমাদের হাত-পা যে বন্দী রে ভাই। লোক : মালিক, একটা কথা ভাবছি আর মনে মনে হাসছি। যে লোকটাকে ধরবার জন্য আপনি এই আলো-আঁধারির রাতে ঘাট পাহারা দিচ্ছেন, ধরেন যে সেই লোকটা সতি্য সতি্য আপনার কাছে হাজির হলো। আপনি তাকে দেখছেন, সেও আপনাকে দেখছে। দেখতে দেখতে আপনার মনের মধ্যে প্রশ্ন হচ্ছে-কে এই লোক ? একে তো আমি চিনি, আমার সঙ্গে স্কুলে পড়ত, আমার বন্ধু। সে লোকটা আপনাকে বলছে-কি রে নর মোহাম্মদ, কেমন আছিস ? আমমিোয়াক্তে⁄৪ম হোসেন, আমাকে ধরবার জন্য গাছে গাছে বিজ্ঞাপন ঝুলিয়েছিস। আমাকে ধরলেই কি আগুন নিভে যাবে ? স্বাধীনতার আগুন কখনো নিভে না। মালিক, আপনি যখন শিক্ষার্থী ছিলেন তখন দেশের জন্য আপনাদের মন কাঁদত। নর : এখনো কাঁদে। যদ্দিন বাঁচব দেশের জন্য কাঁদব। দেশকে ভালোবাসা তো পাপ নয়। যারা
স্বাধীনতা, তোমার আমার স্বাধীনতার জন্য কাজ করছে তাদেরকে আমিও ভালবাসি গরীবুল্লাহ। লোক : তাহলে আপনি আপনার বন্ধুকে ছেড়ে দিবেন না কেন মালিক ? নর : তুমি আবার ঐ একই কথা বললে হে। বলছি তো আমার হাত-পা সব বন্দী। আমি পাহারাদার,
আমি একটা বহুত দিনের পুরাতন যন্ত্র। লোক : মালিক, হামরা যদি সেই যন্ত্রটাকে ভাঙতে বলি। নর : পারবে না, অসম্ভব। লোক : কেন অসম্ভব ? নর : চুপ কর। একটা ডিঙি আসছে। আমি জানতাম আসতেই হবে। আজ আমার ভাগ্য পরীক্ষা। জীবনের সঙ্গে লড়াই। বিপ−বীকে ধরতে পারলে দু’হাজার টাকা পুরস্কার। আমার বড় মেয়ের ধুমধাম করে বিয়ে দিব।
মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য ১২৫
লোক : (গান) আমার ভাইএর রক্তে রাঙানো একুশে ফেবধুয়ারি ……. নর : এই গরীবুল্লাহ, তোমার গান বন্ধ কর। লোক : (গান) ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু ……. নর : শালা ফকিরের বাচ্চা, গান বন্ধ কর। তোমার গলা টিপে গানের চৌদ্দ পুরুষকে জবাই করব
গরীবুল্লাহ। [ নদীর বুক থেকে এই গানের সুরে শিস আসছে, নর মোহাম্মদ গরীবুল্লাহর গলা ছেড়ে দিয়েছে ] নর : কে শিস দিল ?
[ গরীবুল্লাহ নদীর ঘাটে নামছে ] এই শালা ঘাটে নামিস না। ঘুরে দাঁড়া, গুলি করব।
[ গরীবুল্লাহ ঘুরে দাঁড়াল ] কে তুমি ? ঠিকমত পরিচয় দাও। কে তুমি ? লোক : ফকির গরীবুল্লাহ মালিক। শাদুল্লা গায়েনের ব্যাটা। নর : ঝুট। মিথ্যা কথা বলো না। তুমি অন্যলোক। লোক : অন্য কোন্্ লোক ? কে হতে পারি বলুন তো। নর : তুমি ! আপনি কি সেই লোকটা, আসামি বিপ−বী।
[ লোকটি পরচুলা, দাড়ি আর টুপি খুলল ] লোক : মিলছে। চাপা মুখ, কালো চোখ, মাথার চুল ছোট, লম্বা সাড়ে পাঁচ ফুট। দু হাজার টাকার পুরস্কার। ডিঙিতে আমার বন্ধুরা শিষ দিয়েছে ঠিক সময়ে। ঐ যে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ উঠছে। এখন আমি যাব দারোগা সাহেব, যেতেই হবে, আমাদের জরুরি বৈঠক আছে। নর : আপনি যাবেন ? লোক : হহৃা। নর : আমার তকদির। আপনার তো যাওয়া হবে না। লোক : আপনি আমার বন্ধু। যেতে দিন। নর : না, নর মোহাম্মদ দারোগা তোমাকে ছাড়বে না।
[ লোকটি পিস্তল বের করেছে। নর মোহাম্মদের হাতেও পিস্তল। মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ] লোক : স্বাধীনতার আগুন কখনো নিভে না। নর : কাছে এসো না গরীবুল্লাহ। লোক : যদ্দিন বাঁচব দেশের জন্য কাঁদব। যারা স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতার জন্য কাজ করছে তাদেরকে
আমিও ভালোবাসি। নর : গরীবুল্লাহ, না। আর এগিয়ে এস না। লোক : [ এগিয়ে আসছে। নর মোহাম্মদ পিছোচ্ছে : গান ধরেছে ]
নদীর একুল ভাঙে ওকুল গড়ে এই তো নদীর খেলা নর : তোমাকে আমি ছাড়ব না গরীবুল্লাহ, ডিউটি ইজ ডিউটি।
[ পুলিশ দু’জন আসছে, তাদের কথা শোনা যাচ্ছে ] লোক : আমি ঐটার পিছনে বসে থাকব। নর : কেন ? লোক : পালাব না। নর : আহ্্ !
[ লোকটি পিঁপেটার পিছনে লুকাল। পুলিশ দু’জন এসেছে ]
১২৬ মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য
দলিলুর রহমান, আব্দুল বারেক ম-ল। সব কাজ শেষ করেছ ? বারেক : ভালো করে সেঁটে দিয়েছি স্যার। নর : সাবাস। বিপ−বী আর পালাতে পারবে না। দলিল, হ্যারিকেনটা নিভিয়ে দাও। দলিল : জ্বলুক স্যার। ঐ পিঁপেতে রেখে দিই। নর : আহ। দরকার হবে না। আকাশে চাঁদ উঠছে। দলিল : এ চাঁদে আলো নাই স্যার। নর : এখন নাই, মাঝরাতে হবে। থানায় ফিরে যাও তোমরা। বারেক : ফিরে যাব ? কিন্তু আসামি ? নর : আমি একলাই মোকাবিলা করব। বারেক : স্যার, আসামি খুব জাঁহাবাজ। নর : হোক। এ্যাটেনশন, এ্যাবাউট টার্ন।
[ পুলিশ দু’জন যান্ত্রিক নিয়মে চলে গেল, হ্যারিকেনটা জ্বলছে। লোকটি উঠে এল ] লোক : দারোগা সাহেব নর : [হ্যারিকেনটা তুলে নিয়েছে] অমন করে কী দেখছেন ? লোক : আমার পরচুলা আর টুপিটা। অনেক দর যেতে হবে। নর : ঠিকমত পরে নিন।
[ লোকটি পরচুলা আর দাড়ি লাগাচ্ছে ] খুব সাব্রান। আপনার চারদিকে দুশমন। পদে পদে বিপদ। লোক : ঘরে ঘরে আমাদের বন্ধু। নর : আবার কখন দেখা হবে। লোক : একদিন সকালে, যখন আকাশ জুড়ে প্রকা- লাল সর্য উঠবে, অথবা এক রাত্রিতে, যখন আকাশ
ভরে র্পূণ চাঁদ হাসবে।
[ দু’জনে আন্তরিক উষ্ণতায় করমর্দন করল ] নর : আসুন। লোক : হামার নাম ফকির গরীবুল্লাহ। নর : তুমি বিপ−বী মোয়াক্তে⁄৪ম হোসেন, স্বাধীনতার সৈনিক।
[লোকটি নদীর ঘাটে নামছে]
[ নদীর বুক থেকে সম্মিলিত কণ্ঠে গান উচ্চারিত হচ্ছে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি নর মোহাম্মদ, আব্দুল বারেক নীরবে দাঁড়িয়ে আছে] শব্দার্থ ও

টীকা : গঞ্জ – ব্যবসা বাণিজে্যর স্থান, হাট; কৃষ্ণপক্ষ – চান্দ্রমাসের যে পক্ষে চন্দ্রের ক্ষয় হয়; রাহী – পথাচারী, পথিক; নজরে – দৃষ্টিতে; কেবুব – বেয়াকুব, বোকা; ভিন কিসিমের মাল – ভিন্ন বা অন্য রকমের মানুষ; তেলের পিঁপে – তেলের ডধাম; জালুয়া – জেলে, ধীবর; হুক্কা – কাঁসা পিতল দস্তা বা মাটি অথবা নারকেল খোলে প্রস্তুত নলিকাযুক্ত এক প্রকার যন্ত্র যেটি তামাক খেতে বা ধমপান করতে ব্যবহৃত হয়; ধুড়িবাজ – ফন্দিবাজ, প্রতারক; টহলদার – যে টহল দেয়, প্রহরী; নুলা – বিবশ, বিকল; বেহুদা – অনর্থক, বাজে; রোজকিয়ামত – মৃতুর পর পুনরুত্থানের দিন, শেষ বিচারের দিন; খাস্তা – নষ্ট, পীড়িত, বিকৃত; বেদিশা – দিকভ্রষ্টা, দিশেহারা; রুহু – আত্মা, অন্তর; তকদির – ভাগ্য, অদৃষ্ট, কপাল; নাহক – অযথা,
মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য ১২৭
খামখা, অনর্থক; তামাম – সমগ্র, সমস্ত, সমুদয়; জালেম – জুলুমকারী, অত্যাচারী; গজরাতে – আক্ষোশে বা ভয়ে চাপা গজৃন করা; হুজ্জত – গোলমাল, হাঙ্গামা; জামানা – সময়, কাল, যুগ; জাঁহাবাজ – দুর্দান্ত, দজ্জাল; এ্যাটেনশন – সাব্রান হও; এ্যাবাউট টার্ন – ঘুরে দাঁড়াও।

   
   

Certificate Code

সবশেষ ৫টি রিভিউ

top
© eShikhon.com 2015-2020. All Right Reserved