Pay with:

লকডাউনে চলছে – ইশিখনের সর্বকালের সেরা অফার! ৪৩০/- থেকে ১৩৫০/- টাকার প্রতিটি কোর্সের ডিভিডি ডাউনলোড এখন মাত্র ২১৫/- থেকে ৬৭৫ টাকা। বিস্তারিত

ফুলের বিবাহ

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

লেখক পরিচিতি

শব্দার্থ ও টিকা

পাঠ পরিচিতি

অনুশীলনী কর্ম

বৈশাখ মাস বিবাহের মাস। আমি ১লা বৈশাখে নসী বাবুর ফুলবাগানে বসিয়া একটি বিবাহ দেখিলাম। ভবিষ্যৎ বরকন্যাদিগের শিক্ষার্থী লিখিয়া রাখিতেছি।
মল্লিকা ফুলের বিবাহ। বৈকাল-শৈশব অবসানপ্রায়, কলিকা-কন্যা বিবাহযোগ্যা হইয়া আসিল। কন্যার পিতা বড়লোক নহে, ক্ষুদধ বৃক্ষ, তাহাতে আবার অনেকগুলি কন্যাভারাগ্রস্ত। সম্বন্ধের অনেক কথা হইতেছিল, কিন্তু কোনটা স্থির হয় নাই। উদ্যানের রাজা স্থলপদ্ম নির্দোষ পাত্র বটে, কিন্তু ঘড় বড় উঁচু, স্থলপদ্ম অত দর নামিল না। জবা এ বিবাহে অসম্মত ছিল না, কিন্তু জবা বড় রাগী, কন্যাকর্তা পিছাইলেন। গন্ধরাজ পাত্র ভালো, কিন্তু বড় দেমাগ, প্রায় তাঁহার বার পাওয়া যায় না। এইরপ অব্যবস্থার সময়ে ভ্রমররাজ ঘটক হইয়া মল্লিকা- বৃক্ষসদনে উপস্থিত হইলেন। তিনি আসিয়া বলিলেন, ‘গুণ্্ ! গুণ্্ ! গুণ্্ মেয়ে আছে ?’
মল্লিকাবৃক্ষ পাতা নাড়িয়া সায় দিলেন, ‘আছে !’ ভ্রমর পত্রাসন গ্রহণ করিয়া বলিলেন, ‘গুণ্্ গুণ্্ গুণ্্ ! গুণ্্ গুণাগুণ্্ ! মেয়ে দেখিব।’
বৃক্ষ, শাখা নত করিয়া মুদিতনয়না অবগুণ্ঠনবতী কন্যা দেখাইলেন।
ভ্রমর একবার বৃক্ষ কে প্রদ ক্ষিণ করিয়া আসিয়া বলিলেন, ‘গুণ্্ ! গুণ্্ ! গুণ্্ ! গুণ দেখিতে চাই। ঘোমটা খোল।’
লজ্জাশীলা কন্যা কিছুতেই ঘোম্্টা খুলে না। বৃক্ষ বলিলেন, ‘আমার মেয়েগুলি বড় লাজুক। তুমি একটু অপেক্ষা কর, আমমিুখ দেখাইতেছি।’
ভ্রমর ভোঁ করিয়া স্থলপদ্মের বৈঠকখানায় গিয়া রাজপুত্রের সঙ্গে ইয়ারকি করিতে বসিলেন। এদিকে মল্লিকার সন্ধ্যাঠাকুর াণী-দিদি আসিয়া তাহাকে কত বুঝাইতে লাগিল – বলিল, ‘দিদি, একবার ঘোম্্টা খোল – নইলে, বর আসিবে না – ল২ী আমার, চাঁদ আমার, সোনা আমার, ইত্যাদি।’ কলিকা কতবার ঘাড় নাড়িল, কতবার রাগ করিয়া মুখ ঘুরাইল, কত বার বলিল, ‘ঠান্্দিদি, তুই যেটি !’ কিন্তু শেষে সন্ধ্যার স্নিগ্ধ স্বভাবে মুগ্ধ হইয়া
মুখ খুলিল। তখন ঘটক মহাশয় ভোঁ করিয়া রাজবাড়ী হইতে নামিয়া আসিয়া ঘটকালীতে মন দিলেন। কন্যার পরিমলে মুগ্ধ হইয়া বলিলেন, ‘গুণ্্ গুণ্্ গুণ্্ গুণ গুণাগুণ্্ ! কন্যা গুণবতী বটে। ঘরে মধু কত ?’
কন্যাকর্তা বৃক্ষ বলিলেন, ‘ফর্দ দিবেন, কড়ায় গ-ায় বুঝাইয়া দিবে।’ ভ্রমর বলিলেন, ‘গুণ্্ গুণ্্, আপনার অনেক গুণ – ঘটকালীটা ?’
কন্যাকর্তা শাখা নাড়িয়া সায় দিল, ‘তাও হবে।’
ভ্রমর-‘বলি ঘটকালীর কিছু আগাম দিলে হয় না ?’ নগদ দান বড় গুণ-গুণ্্ গুণ্্ গুণ্।’
ক্ষুদধ বৃক্ষটি তখন বিরক্ত হইয়া, সকল শাখা নাড়িয়া বলিল, ‘আগে বরের কথা বল – বর কে ?’
ভ্রমর-‘বর অতি সুপাত্র।- তাঁর অনেক গুণ-ন-ন্।’
এ সকল কথোপকথন মনুষে্য শুনিতে পায় না, আমি কেবল দিব্য কর্ণ পাইয়াই এ সকল শুনিতেছিলাম। আমি শুনিতে লাগিলাম, কুলাচার্য মহাশয়, পাখা ঝাড়িয়া, ছয় পা ছড়াইয়া গোলাবের মহিমা কীর্তন করিতেছিলেন। বলিতেছিলেন যে, গোলাব বংশ বড় কলীন; কেন না, ইহারা ‘ফুলে’ মেল। যদি বল, সকল ফুলই ফুলে, তথাপি গোলাবের গৌরব অধিক; কেন না, ইহারা সাক্ষাৎ বাঞ্চামালীর সন্তান; তাহার স্বহস্তরোপিত। যদি বল, এ ফুলে কাঁটা আছে, কোন্্ কুলে বা কোন্্ ফুলে নাই ?
যাহা হউক, ঘটকরাজ কোনরপে সম্বন্ধ স্থির করিয়া, বোঁ করিয়া উড়িয়া গিয়া, গোলাব বাবুর বাড়িতে খবর দিলেন। গোলাব, তখন বাতাসের সঙ্গে নাচিয়া নাচিয়া, হাসিয়া হাসিয়া, লাফাইয়া লাফাইয়া খেলা করিতেছিল, বিবাহের নাম শুনিয়া আহ্লাদিত হইয়া কন্যার বয়স জিজ্ঞাসা করিল। ভ্রমর বলিল, ‘আজি কালি ফুটিবে।’
গোধুলি লগ্ন উপস্থিত, গোলাব বিবাহে যাত্রার উদ্যোগ করিতে লাগিলেন। উচ্চিঙ্গড়া নহবৎ বাজাইতে আরম্ভ করিল ; মৌমাছি সানাইয়ের বায়না লইয়াছিল, কিন্তু রাতকানা বলিয়া সঙ্গে যাইতে পারিল না। খদ্যোতেরা ঝাড় ধরিল ; আকাশে তারাবাজি হইতে লাগিল। কোকিল আগে আগে ফুকরাইতে লাগিল। অনেক বরযাত্রা চলিল; স্বয়ং রাজকুমার স্থলপদ্ম দিবাবসানে অসুস্থকর বলিয়া আসিতে পারিলেন না, কিন্তু জবাগোষ্ঠী – শ্বেত জবা, রক্ত জবা, জরদ জবা প্রভৃতি সবংশে আসিয়াছিল। করবীরের দল, সেকেলে রাজাদিগের মত বড় উচ্চ ডালে চড়িয়া আসিয়া উপস্থিত হইল। সেঁউতি নীতবর হইবে বলিয়া, সাজিয়া আসিয়া দুলিতে লাগিল। গরদের জোড় পরিয়া চাঁপা আসিয়া দাঁড়াইল – উগ্র গন্ধ ছুটিতে লাগিল। গন্ধরাজেরা বড় বাহার দিয়া, দলে দলে আসিয়া, গন্ধ বিলাইয়া দেশ মাতাইতে লাগিল। অশোক নেশায় লাল হইয়া আসিয়া উপস্থিত; সঙ্গে এক পাল পিপ্্ড়া মোসায়েব হইয়া আসিয়াছে; তাহাদের গুণের সঙ্গে সম্বন্ধ নাই, কিন্তু দাঁতের জ্বালা বড়-কোন্্ বিবাহে না এরপ বরযাত্র জোটে, আর কোন্্ বিবাহে না তাহারা হুল ফুটাইয়া বিবাদ বাধায় ? কুরুবুক কুটজ প্রভৃতি আরও অনেক বরযাত্র আসিয়াছিলেন, ঘটক মহাশয়ের কাছে তাঁহাদের পরিচয় শুনিবেন। সর্বত্রই তিনি যাতায়াত করেন এবং কিছু কিছু মধু পাইয়া থাকেন।
আমারও নিমন্ত্রণ ছিল, আমিও গেলাম। দেখি, বরপক্ষের বড় বিপদ। বাতাস বাহকের বায়না লইয়াছিলেন; তখন হুঁ-হুম করিয়া অনেক র্ম্দানি করিয়াছিলেন, কিন্তু কাজের সময় কোথায় লুকাইলেন, কেহ খুঁজিয়া পায়
না। দেখিলাম, বর বরযাত্র, সকলে অবাক হইয়া স্থিরভাবে দাঁড়াইয়া আছেন। মল্লিকাদিগের কুল যায় দেখিয়া, আমিই বাহকের কার্য স্বীকার করিলাম। বর, বরযাত্র সকলকে তুলিয়া লইয়া মল্লিকাপুরে গেলাম।
সেখানে দেখিলাম, কন্যাকুল, সকল ভগিনী, আহ্লাদে ঘোমটা খুলিয়া মুখ ফুটাইয়া, পরিমল ছুটাইয়া, সুখের হাসি হাসিতেছে। দেখিলাম, পাতায় পাতায় জড়াজড়ি, গন্ধের ভা-ারে ছড়াছড়ি পড়িয়া গিয়াছে-রপের ভারে সকলে ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে। যুথি, মালতী, বকুল, রজনীগন্ধা প্রভৃতি এয়োগণ স্ত্রী-আচার করিয়া বরণ করিল। দেখিলাম, পুরোহিত উপস্থিত; নসী বাবুর নবমবর্ষীয়া কন্যা (জীবন্ত কুসুমপুপিণী) কুসুমলতা সচ সুতা লইয়া দাঁড়াইয়া আছে; কন্যাকর্তা কন্যা সম্পধদান করিলেন; পুরোহিত মহাশয় দুইজনকে এক সতায় গাঁথিয়া গাঁটছড়া বাঁধিয়া দিলেন।
তখন বরকে বাসর-ঘরে লইয়া গেল। কত যে রসময়ী মধুময়ী সুন্দরী সেখানে বরকে ঘেরিয়া বসিল, তাহা কি বলিব। প্রাচীনা ঠাকুরাণীদিদি টগর সাদা প্রাণে বাঁধা রসিকতা করিতে করিতে শুকাইয়া উঠিলেন। রঙ্গণের রাঙ্গামুখে হাসি ধরে না। যুই, কনে্যর সই, কনে্যর কাছে গিয়া শুইল; রজনীগন্ধাকে বর তাড়কা রাক্ষসী বলিয়া কত তামাসা করিল; বকুল একে বালিকা, তাতে যত গুণ, তত রপ নহে; এককোণে গিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল; আর ঝুম্্কা ফুল বড় মানুষের গৃহিণীর মত মোটা নীল শাড়ী ছড়াইয়া জমকাইয়া বসিল। তখন- ‘কমলকাকা-ওঠ বাড়ি যাই- রাত হয়েছে, ও কি, ঢুলে পড়বে যে ?’ কুসুমলতা এই কথা বলিয়া আমার গা ঠেলিতেছিল; – চমক হইলে, দেখিলাম কিছুই নাই। সেই পুষ্পবাসর কোথায় মিশিল ? – মনে করিলাম, সংসার অনিত্যই বটে-এই আছে এই নাই। সে রম্য বাসর কেথায় গেল,- সেই হাস্যমুখী শুভ্রিস্মতসুধাময়ী পুষ্পসুন্দরীসকল কোথায় গেল ? যেখানে সব যাইবে, সেইখানে- স্মৃতির দর্পণতলে, ভতসাগরগর্ভে। যেখানে রাজা প্রজা, র্পূবত সমুদধ, গ্রহ নক্ষত্রাদি গিয়াছে বা যাইবে, সেইখানে – ধ্বংসপুরে! এই বিবাহের ন্যায় সব শনে্য মিশাইবে, সব বাতাসে গলিয়া যাইবে – কেবল থাকিবে – কী ? ভোগ ? না, ভোগ্য না থাকিলে ভোগ থাকিতে পারে না। তবে কী ? স্মৃতি ? কুসুম বলিল, ‘ওঠ না-কি কচ্চো ?’ আমি বলিলাম, ‘দর পাগলি, আমি বিয়ে দিচ্ছিলাম।’ কুসুম ঘেঁষে এসে, হেসে হেসে কাছে দাঁড়াইয়া আদর করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘কার বিয়ে, কাকা ?’ আমি বলিলাম, ‘ফুলের বিয়ে।’ ‘ওঃ পোড়া কপাল, ফুলের ? আমি বলি কি ! আমিও যে এই ফুলের বিয়ে দিয়েছি।’ ‘কই ?’ ‘এই যে মালা গাঁথিয়াছি।’ দেখিলাম, সেই মালায় আমার বর কন্যা রহিয়াছে। ❑

   
   

Certificate Code

সবশেষ ৫টি রিভিউ

top
© eShikhon.com 2015-2020. All Right Reserved