Pay with:

লকডাউনে চলছে – ইশিখনের সর্বকালের সেরা অফার! ৪৩০/- থেকে ১৩৫০/- টাকার প্রতিটি কোর্সের ডিভিডি ডাউনলোড এখন মাত্র ২১৫/- থেকে ৬৭৫ টাকা। বিস্তারিত

নিরীহ বাঙালি

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

লেখক পরিচিতি

শব্দার্থ ও পাঠ পরিচিতি

অনুশীলনী কর্ম

আমরা দুর্বল নিরীহ বাঙালি। এই বাঙালি শব্দে কেমন সুমধুর তরল কোমল ভাব প্রকাশ হয়। আহা ! এই অমিয়াসিক্ত বাঙালি কোন্ বিধাতা গড়িয়াছিলেন ? কুসুমের সৌকুমার্য, চন্দ্রের চন্দিধকা, মধুর মাধুরী, যুথিকার সৌরভ, সুপ্তির নীরবতা, ভব্দরের অচলতা, নবনীর কোমলতা, সলিলের তরলতা-এক কথায় বিশ্বজগতের সমুদয় সৌন্দর্য এবং স্নিগ্ধতা লইয়া বাঙালী গঠিত হইয়াছে ! আমাদের নামটি যেমন শ্রুতিমধুর তদধুপ আমাদের সমুদয় ক্ষিয়াকলাপও সহজ ও সরল। আমরা মর্তিমতী কবিতা-যদি ভারতবর্ষকে ইংরাজি ধরণের একটি অট্টালিকা মনে করেন, তবে বঙ্গদেশ তাহার বৈঠকখানা (ফৎধরিহম ৎড়ড়স) এবং বাঙালি তাহাতে সাজসজ্জা (ফৎধরিহম ৎড়ড়স ংঁরঃ)! যদি ভারতবর্ষকে একটা সরোবর মনে করেন, তবে বাঙালি তাহাতে পদ্মিনী। যদি ভারতবর্ষকে একখানা উপন্যাস মনে করেন, তবে বাঙালি তাহার নায়িকা! ভারতের পুরুষ সমাজে বাঙালি পুরুষিকা! অতএব আমরা মর্তিমান কাব্য। আমাদের খাদ্যদধব্যগুলো,-পুঁইশাকের ডাঁটা, সজিনা ও পুঁটমিৎসে্যর ঝোল-অতিশয় সরস। আমাদের খাদ্যদধব্যগুলো-ঘৃত, দুগ্ধ, ছানা, নবনীত, ক্ষীর, সর, সন্দেশ ও রসগোল্লা-অতিশয় সুস্বাদু। আমাদের দেশের প্রধান ফল, আমধ ও কাঁঠাল-রসাল এবং মধুর। অতএব আমাদের খাদ্যসামগ্রী ত্রিগুণাত্মক-সরস, সুস্বাদু, মধুর।
খাদ্যের গুণ অনুসারে শরীরের পুষ্টি হয়। তাই সজিনা যেমন বীজবহুল, আমাদের দেশে তেমনই ভুঁড়িটি স্থল। নবনীতে কোমলতা অধিক, তাই আমাদের স্বভাবের ভীরুতা অধিক। শারীরিক সৌন্দর্য সম্বন্ধে অধিক বলা নি®প্রয়োজন; এখন পোষাক পরিচ্ছদের কথা বলি।
আমাদের বর অঙ্গ যেমন তৈলসিক্ত নবনিগঠিত সুকোমল, পরিধেয়ও তদধুপ অতি সূ২ শিমলার ধতি ও চাদর। ইহাতে বায়ুসঞ্চালনের (ঠবহঃরষধঃরড়হ এর) কোন বাধা বিঘœ হয় না ! আমরা সময় সময় সভ্যতার অনুরোধে কোট শার্ট ব্যবহার করি বটে, কারণ পুরুষমানুষের সবই সহ্য হয়। কিন্তু আমাদের অর্ধাঙ্গী-হেমাঙ্গী, কেষ্ণাঙ্গিগণ তদানুকরণে ইংরাজ ললনাদের নির্লজ্জ পরিচ্ছদ (শেমিজ জ্যাকেট) ব্যবহার করেন না। তাঁহারা অতিশয় সুকুমারী ললিতা লজ্জাবতী লতিকা, তাই অতমিসৃণ ও সূ২ ‘হাওয়ার শাড়ি’ পরেন। বাঙালির সকল বস্তুই সুন্দর, স্বচ্ছ ও সহজলব্ধ।
মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য ৪৭
বাঙালির গুণের কথা লিখিতে হইলে অনন্ত মসী, কাগজ ও অক্লান্ত লেখকের আবশ্যক। তবে সংক্ষেপে দুটি চারিটা গুণের বর্ণনা করি। ধনবৃদ্ধির দুই উপায়, বাণিজ্য ও কৃষি। বাণিজ্য আমাদের প্রধান ব্যবসায়। কিন্তু তাই বলিয়া আমরা (আরবে্যাপন্যাসের) সিন্ধবাদের ন্যায় বাণিজ্যপোত অনিশ্চিত ফললাভের আশায় অনন্ত অপার সাগরে ভাসাইয়া দিয়া নৈরাশে্যর ঝঞ্ঝাবাতে ওতপ্রোত হই না। আমরা ইহাকে (বাণিজ্য) সহজ ও স্বল্পায়াসসাধ্য করিয়া লইয়াছি। অর্থাৎ বাণিজি্য ব্যবসায়ে যে কঠিন পরিশধম আবশ্যক, তাহা বর্জন করিয়াছি। এই জন্য আমাদের দোকানে প্রয়োজনীয় জিনিষ নাই, শুধু বিলাসদধব্য-নানাবিধ কেশতৈল ও নানাপ্রকার রোগবর্ধক ঔষধ এবং রাঙা পিত্তলের অলঙ্কার, নকল হীরার আংটি, বোতাম ইত্যাদি বিক্ষয়ার্থ মজুদ আছে। ঈদৃশ ব্যবসায়ে কায়িক পরিশধম নাই। আমরা খাঁটি সোনা রপা জওযাহেরাৎ রাখি না, কারণ টাকার অভাব। বিশেষতঃ আজি কালি কোন্ জিনিষটার নকল না হয় ? যখনই কেহ একটু যতœ পরিশধম স্বীকার র্পূবক “দীর্ঘকেশী” তৈল প্রস্তুত করেন, অমনই আমরা তদনুকরণে “হ্রস্বকেশী” বাহির করি। “কুন্তলীনের” সঙ্গে “কেশলীন” বিক্ষয় হয়। বাজারে “মিস্তষ্ক স্নিগ্ধকারী” ঔষধ আছে, “মিস্তষ্ক উষ্ণকারী” দধব্যও আছে। এক কথায় বলি, যত প্রকারের নকল ও নি®প্রয়োজনীয় জিনিষ হইতে পারে, সবই আছে। আমরা ধান্য ত-ুলের ব্যবসায় করি না, কারণ তাহাতে পরিশধম আবশ্যক। আমাদের অন্যতম ব্যবসায়-পাস বিক্ষয়। এই পাস বিক্ষেতার নাম “বর” এবং ক্ষেতাকে “শ্বশুর” বলে। এক একটি পাসের মল্য কত জান ? “অর্ধেক রাজত্ব ও এক রাজকুমারী”। এম,এ, পাস অমল্যরতœ, ইহা যে সে ক্ষেতার ক্ষেয় নহে। নিতান্ত সস্তা দরে বিক্ষয় হইলে, মল্য-এক রাজকুমারী এবং সমুদয় রাজত্ব। আমরা অলস, তরলমতি, শধমকাতর, কোমলাঙ্গ বাঙালি কিনা তাই ভাবিয়া দেখিয়াছি, সশরীরে পরিশধম করিয়া মুদধালাভ করা অপেক্ষা ঙষফ ভড়ড়ষ শ্বশুরের যথাসর্বস্ব লুণ্ঠন করা সহজ। এখন কৃষিকার্যের কথা বলি। কৃষি দ্বারা অন্নবৃদ্ধি হইতে পারে। কিন্তু আমরা ভাবিয়া দেখিয়াছি কৃষিবিভাগের কার্য (অমৎরপঁষঃঁৎব) করা অপেক্ষা মিস্তষ্ক উর্বর (ইৎধরহ পঁষঃঁৎব) করা সহজ। অর্থাৎ কর্কশ উর্বর ভমি কর্ষণ করিয়া ধান্য উৎপাদন করা অপেক্ষা মুখস্থ বিদ্যার জোরে অর্থ উৎপাদন করা সহজ। এবং কৃষিকার্যে পারদর্শিতা প্রদর্শন করা অপেক্ষা কেবল গ.জ.অ.ঈ পাশ করা সহজ। আইনচর্চা করা অপেক্ষা কৃষি বিষয়ে জ্ঞানচর্চা করা কঠিন। অথবা রৌদ্রের সময় ছত্র হেস্ত কৃষিক্ষেত্র পরিদর্শনের জন্য কৃষি বিষয়ে জ্ঞানচর্চা অপেক্ষা টানাপাখার তলে আরাম কেদারায় বসিয়া দুর্ভিক্ষ সমাচার (ঋধসরহব জবঢ়ড়ৎঃ) পাঠ করা সহজ। তাই আমরা অন্নোৎপাদনের চেষ্টা না করিয়া অর্থ উৎপাদনে সচেষ্ট আছি। আমাদের অর্থের অভাব নাই, সুতরাং অন্নকষ্টও হইবে না। দরিদধ হতভাগা সব অন্নাভাবে মরে মরুক, তাতে আমাদের কি ? আমরা আরও অনেক প্রকার সহজ কার্য নির্বাহ করিয়া থাকি। যথা : (১) রাজ্য স্থাপন করা অপেক্ষা “রাজ্য” উপাধি লাভ সহজ। (২) শিল্পকার্যে পারদর্শী হওয়া অপেক্ষা ই.ঝপ ও উ.ঝপ পাস করা সহজ। (ক্ত) অল্পবিস্তর অর্থব্যয়ে দেশে কোন মহৎ কার্য দ্বারা খ্যাতি লাভ করা অপেক্ষা “খাঁ বাহাদুর” বা “রায়
বাহাদুর” উপাধি লাভের জন্য অর্থ ব্যয় করা সহজ। (৪) প্রতিবেশী দরিদধদের শোক দুঃখে ব্যথিত হওয়া অপেক্ষা বেদেশীয় বড় লোকদের মৃতুদুঃখে “শোক
সভার” সভ্য হওয়া সহজ। (৫) দেশের দুর্ভিক্ষ নিবারণের জন্য পরিশধম করা অপেক্ষা আমেরিকার নিকট ভিক্ষা গ্রহণ করা সহজ।
৪৮ মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য
(৬) স্বাস্থরক্ষায় যতœবান হওয়া অপেক্ষা স্বাস্থ নষ্ট করিয়া ঔষধ ও ডাক্তারের হেস্ত জীবন সমর্পণ করা
সহজ। (৭) স্বােস্থর উন্নতি দ্বারা মুখশধীর প্রফুল্লতা ও সৌন্দর্য বর্ধন করা (অর্থাৎ যবধষঃযু ্ পযববৎভঁষ হওয়া) অপেক্ষা (শুষ্কগন্ডে!) কালিডোর, মিল্ক অভ রোজ ও ভিনোলিয়া পাউডার (কধষুফড়ৎব, সরষশ ড়ভ ৎড়ংব ধহফ ঠরহড়ষরধ ঢ়ড়ফিবৎ) মাখিয়া সুন্দর হইতে চেষ্টা করা সহজ। (৮) কাহারও নিকট প্রহারলাভ করিয়া তৎক্ষণাৎ বাহুবলে প্রতিশোধ লওয়া অপেক্ষা মানহানির মোকদ্দমা
করা সহজ ইত্যাদি। তারপর আমরা মর্তিমান আলস্য-আমাদের গৃহিণীগণ এ বিষয়ে অগ্রণী। কেহ কেহ শধীমতীদিগকে স্বহেস্ত রন্ধন করিতে অনুরোধ করিয়া থাকেন। কিন্তু বলি, আমরা যদি রৌদধতাপ সহ্য করিতে না পারি, তবে আমাদের অর্ধাঙ্গীগণ কিরপে অগ্নিত উত্তাপ সহিবেন ? আমরা কোমলাঙ্গ-তাঁহারা কোমলাঙ্গী; আমরা পাঠক, তাঁহারা পাঠিকা; আমরা লেখক, তাঁহারা লেখিকা। অতএব আমরা পাচক না হইলে তাঁহারা পাচিকা হইবেন কেন ? সুতরাং যে ল২ীছাড়া দিব্যাঙ্গনাদিগকে রন্ধন করিতে বলে, তাহার ত্রিবিধ দন্ড হওয়া উচিত। যথা তাহাকে (১) তুষানলে দগ্ধ কর, অতঃপর (২) জবেহ্ কর, তারপর (ক্ত) ফাঁসি দাও ! আমরা সকলেই কবি-আমাদের কাবে্য বীররস অপেক্ষা করুণরস বেশি। আমাদের এখানে লেখক অপেক্ষা লেখিকার সংখ্যা বেশি। তাই কবিতার সেধাতে বিনা কারণে অশ্রুপ্রবাহ বেশি বহিয়া থাকে। আমরা পদ্য লিখিতে বসিলে কোন্ বিষয়টা বাদ দিই ? “ভগ্ন শর্প”, “জীর্ণ কাঁথা”, “পুরাতন চটিজুতা”-কিছুই পরিতাজ্য নহে। আমরা আবার কত নতুন শব্দের সৃষ্টি করিয়াছি; যথা-“অতি শুভ্রনীলাম্বর”, “সাশ্রুসজলনয়ন” ইত্যাদি। শধীমতীদের করুণ বিলাপ-প্রলাপর্পূণ পদ্যের “অশ্রুজলের” বন্যায় বঙ্গদেশ ধীরে ধীরে ডুবিয়া যাইতেছে ! সুতরাং দেখিতেছেন, আমরা সকলেই কবি। আর আত্মপ্রশংসা কত করিব ? এখন উপসংহার করি।

   
   

© eShikhon.com 2015-2020. All Right Reserved